ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এখন ঘুম ভাঙলেই লাশ! প্রিয়জনের লাশ। প্রতিবেশীর লাশ। বাবার কোলে সন্তানের লাশ। মায়ের বুকে নবজাতকের লাশ। ধ্বংসস্তূপের নিচে লাশ। অসহায়-নিরুপায় চোখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয় সেসব হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ভোরের আলো ফুটতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরাইলের রক্তখেকো দানব বিমানগুলো। শুরু হয় পৈশাচিক হামলা। চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে আপনজনেরা-ঘর ভেসে যাচ্ছে রক্তে; দেওয়ালে দেওয়ালে ছিটকে পড়ছে মাংসের দলা! গত তিন দিন ধরে এই দৃশ্যই দেখছে গাজার রক্তাক্ত জনপদ। শুধু বৃহস্পতিবার সকালেই ভূখণ্ডটির উত্তর ও দক্ষিণে ইসরাইলের হামলায় নারী ও শিশুসহ নিহত হয়েছেন ১১০ ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন ১৩৩ জন। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২০ মিনিটে যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ জাকুত।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বিৃতিতে বলা হয়, ‘গত তিন দিনে ২০০ শিশুসহ গাজায় ৬০০শ’র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত ছাড়িয়েছে ১০০০। আহতদের মধ্যে অনেকেই মৌলিক সরঞ্জাম এবং ওষুধের অভাবে মারা গেছেন। জ্বালানি, ওষুধ, অক্সিজেন এবং অন্যান্য সরবরাহের তীব্র ঘাটতির কারণে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে গাজার হাসপাতালে। অবরুদ্ধ জনপদের প্রায় ৮০ শতাংশ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নেই।’ উত্তর গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের পরিচালক মারওয়ান আল-সুলতান বলেছেন, চিকিৎসাকেন্দ্রটি ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতির’ সম্মুখীন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উত্তর গাজা একটি কঠিন রাত ছিল এবং আমরা বিপুলসংখ্যক আহতের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি। আলজাজিরা, আরব নিউজ।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় আগ থেকেই মুখ থুবড়ে পড়েছে গাজার যুদ্ধবিরতি। এর মধ্যেই মঙ্গলবার সেহরির পরপরই হঠাৎ বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। বৃহস্পতিবার সেহরি শেষ হতেই আবারও ঘুমন্ত গাজাবাসীর ওপর হামলা চালায় ইসরাইল। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম খান ইউনিসের বেশ কয়েকটি স্থানে হামলা চালায়। এর কিছুক্ষণ পরেই শুরু করে স্থল অভিযান। উত্তরের বেত লাহিয়ায় বেশ কয়েকটি ট্যাংক থেকে হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। পরে দক্ষিন গাজার রাফাহ অঞ্চলেও বড় পরিসরে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরাইল সেনাবাহিনী। স্থল অভিযানের আগে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের বেশ কিছু এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। খান ইউনিস এবং রাফাহ শহরে বেসামরিকদের ১০টি আবাসিক ভবনকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বিমান হামলা। উত্তর গাজার একটি আবাসিক বিল্ডিং সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলার আগে বেসামরিকদের কোনো ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে না ইসরাইল। হামলা হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান আয়মান আশলেই খান ইউনিসের স্থল অভিযানে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করছে ইসরাইল ।
পালটা হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসও। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘গাজা উপত্যকা থেকে রকেট নিক্ষেপ’র পর তেল আবিবে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরাইলের দাবি, তারা একটি রকেট ভূপাতিত করেছে এবং অন্য দুটি খোলা জায়গায় পড়েছে। হামলার এ ঘটনায় তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে
মিসর-কাতারে বৈঠক : হামলার মাঝেই বৃহস্পতিবার গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসেছে মধ্যস্থতাকারী দুই দেশ মিসর ও কাতার। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি ফোনে কথা বলেছেন।
তারা গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার এবং এর তিনটি রূপরেখার পর্যায় বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও তারা আরব নেতৃত্বাধীন গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার উপায়গুলোও নিয়ে আলোচনা করছেন। আল-আরবি আল-জাদেদের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় একটি নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার বিষয়ে মিসরের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে হামাসের একটি প্রতিনিধি দলও এদিন কায়রোতে বৈঠকে বসেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরাইলে হামলা চালায়। ২৫১ জনকে জিম্মি করে। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরাইল। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, ইসরাইলের নির্বিচার হামলায় নারী শিশুসহ ৪৯,৬১৭ জন (বাংলাদেশ সময় রাত ৯.২০ মিনিট পর্যন্ত) নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১১২,৯৫০ জন।
হামলায় ‘পূর্ণ সমর্থন’ রয়েছে ট্রাম্পের : ইসরাইলের পুনরায় বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের ‘পূর্ণ সমর্থন’ রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বৃহস্পতিবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট ।